Article

Sai Antara

January 30, 2021

সেই অন্তরা ছোট গল্প  

পাতা ১ থেকে ৫

লেখিকা সুলতানা বেগম 


আজ বিকেল তখন পাঁচটা হবে, হঠাৎ একটা কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো আমার কানে |

গরমকাল,হালকা বাতাস বইছিল, আমি তখন দোতলার একটা ঘরে জানালার পাশে বসে একাকী গল্পের বই পড়ছিলাম | কান্নার আওয়াজ শুনে বাইরে বেরিয়ে এলাম | এসেই চোখ পড়ল উঠানের দিকে  | দেখি একটা মেয়ে জেঠিমার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে, আর বিড়বিড় করে যেন কি বলে চলেছে, ঠিক বুঝতে পারলাম না |


 আমি মেয়েটাকে দেখার জন্য এক পা, এক পা করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে উঠানের দিকে যেতে  লাগলাম | যতই এগোচ্ছি, ততই যেন অবাক হচ্ছি | মনে হচ্ছে যেন আমার অনেক দিনের চেনা পুরনো মুখ | কে সে?, তাকে জানার বড় কৌতূহল হল মনে | কিন্তু তার কাছে যাবার মতো সাহস হলো না |


 মনে হল যেন সেই অন্তরা, যাকে আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে আমাদের কলেজে প্রথম দেখেছিলাম | কিন্তু আজ একি বেশ অন্তরার !!না, নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছি না | সেই দশ বছর আগে কত সুন্দরী না ছিল সে, বড় বড় টানা টানা হরিণীর মত দুটো চোখ, উজ্জল গায়ের রং, শাড়ির রঙ মিলিয়ে জুতো, কপালে টিপ | যখন বান্ধবীদের সঙ্গে গল্প করতে করতে হাসত তখন মনে হত যেন পূর্ণিমার চাঁদ হাসছে | কিন্তু হঠাৎ অন্তরা  এমন হয়ে গেল কেন ? গায়ের রঙ যেন কেমন তামাটে হয়ে গেছে, চোখ দুটো গর্তে ঢুকে গেছে, পায়ে কোন জুতো নেই, নেই কপালে টিপ, এমনকি হাতে চুড়ি পর্যন্ত নেই |

 এসব দেখে আমি যেন নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারলাম না | সব বাধা, ভয় অতিক্রম করে তার কাছে এগিয়ে গেলাম | তাকে অন্তরা বলে ডাক দিলে মেয়েটা যেন আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকালো | আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কি সেই অন্তরা ? সে আমাকে চিনতে পারল না ? মেয়েটার নাম ধরে ডাকা দেখে জেঠিমা আমাকে জিজ্ঞাসা করল,” তুই মেয়েটাকে চিনিস নাকি ?” আমি বললাম  “হ্যাঁ, আমি চিনি, আমরা বি, এ একই কলেজে পড়তাম, জেঠিমা আমার কথা শুনে বললে,” তাহলে তুই ততক্ষণ দীপাকে তোর ঘরে নিয়ে যা |”  দীপা অন্তরার ডাকনাম,  সেই ডাক নামটা আমার জানা ছিল না | জেঠিমা বড় ভালোবাসতো আমাকে | তাই আমার যেন কোনো ক্ষতি না  হয়, বা আমি খারাপ হয়ে না যাই, তাই জেঠিমা কোন মেয়ের সঙ্গে তেমন কথা বলতে বা মিশতে দিতো না | কিন্তু জেঠিমা আজ নিজ মুখে বললে অন্তরাকে আমার ঘরে নিয়ে যেতে | একটু অবাক হলাম জেঠিমার কথা শুনে, কিন্তু ভালো লেগেছিল আমি অন্তরাকে আমার ঘরে নিয়ে গেলাম |


 মুখখানা ম্লান্ কোন কথা নেই মুখে, চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে ঘরের জানালার পাশে  | আমি অন্তরা কে একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে তাতে বসতে বললাম | সে চেয়ারে বসলো  আমি অন্তরা বলে ডাকতে সে আমার দিকে তাকালো অবাক নয়নে | আমি তাকে বললাম “তুমি আমাকে চিনতে পারবে না, কিন্তু আমি তোমাকে চিনি | তুমি যখন কলেজে বি, এ, প্রথম বর্ষে পড়তে, তখন আমি দ্বিতীয় বর্ষে | তুমি যেদিন প্রথম কলেজে এসেছিলে আমি সেদিনই তোমাকে লক্ষ করেছিলাম ! টানা টানা বড় বড় হরিণীর মতো দুটো চোখ | সেই চোখে কাজল পরা, নীল রঙের শাড়ি, শাড়ির রঙ মিলিয়ে পায়ে জুতো, কপালে একটা টিপ | সবমিলিয়ে তোমাকে মনে হচ্ছিল যেন কোন গল্পের রাজকন্যা |”


তোমার লম্বা চুলের বিনুনি টা কোমরে দুলছিল | সেদিন তোমার সঙ্গে আলাপ করার বড় ইচ্ছে হচ্ছিল | কিন্তু সাহস হয়নি | তারপর তুমি যখন ক্লাসের ভিতর চলে গেলে আমার অতৃপ্ত চোখদুটো বারবার তোমাকে দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠছিল | তখন আমার মন বলছিল তোমার সঙ্গে আলাপ করলে ভালো হতো, একটু কথা বললে ভালো হতো, কিন্তু তোমার নাম জানতাম না, তোমাকে কি বলে ডাকবো, কি বলে তোমার সঙ্গে কথা বলবো | ঠিক যেন সাহস করে উঠতে পারেনি সে সময় | তোমার কাছে গিয়ে নামটা জিজ্ঞাসা করলে হয়তো বা বলতে | তুমি যখন কলেজের তিনতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লিলি,আর কেয়ার সঙ্গে গল্প করছিলে আর হাসছিল, আমি তখন কলেজের গেটের কাছে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে তোমার দিকে তাকিয়ে ছিলাম |


 তোমার শাড়ির আঁচল হাওয়াই উড়ছিল, মাথার চুল গুলো এল মেলো হয়ে মুখে পড়ছিল | আর তুমি তোমার এক গাছা চুড়ি পরা হাত দিয়ে বারবার চুল গুলো সরিয়ে দিচ্ছিলে, আর সেই চুড়ির  মিষ্টি আওয়াজ আমার কানে ভেসে আসছিল | তুমি যখন  কথার মাঝে মাঝে হাসছিলে তখন তোমাকে ভারী মিষ্টি দেখাচ্ছি | মনে হচ্ছিল তুমি যেন এক পূর্ণিমার চাঁদ, তোমরা তখন  কী গল্প করছিলে ঠিক জানিনা | তবে অনুমান করছিলাম, ভাবছিলাম হয়ত কোন ভালবাসার গল্প হবে, নয় তোবা কোন পথ যাত্রীর কলেজে আসার সময় বাসের মধ্যে যে ছেলেটি বারবার তোমার দিকে তাকাচ্ছিল, আর তোমাকে দেখে মুগ্ধ হচ্ছিল | আর তুমি সেই ছেলেটির তাকানোর ভঙ্গিমা  লক্ষ করছিলে মাঝে মাঝে | আর মনে মনে হাসছিলে | 


জোরে প্রাণ খুলে হাসতে পারো নি বাসের উপরে | আমি তাই ছেলেটাকে তখন বড্ড ভাগ্যবান বলে মনে করছিলাম,যে সেই ছেলেটি কত কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছে তোমাকে | কিন্তু আমি চির অপরিচিত রয়ে যাব হয়তো তোমার কাছে | তারপর থেকে আমি প্রায়ই তোমাকে লক্ষ্য করতাম বিশেষ করে তুমি যখন তোমার বান্ধবী দের সাথে তিনতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে গল্প করতে | আর আমি কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে থেকে তোমাকে দেখতাম, যাতে কেউ আমাকে বুঝতে না পারে | আর তুমিও যেন না মনে করো যে আমি তোমাকে হ্যাংলার মতো দেখে থাকি | ভেবেছিলাম সামনে রবীন্দ্র জয়ন্তী, কোন এক বিষয় নিয়ে তোমার সঙ্গে আলোচনা  করার বাহানায় তোমার সাথে পরিচয় করব | কথাটা আমি আমার বন্ধু রবি  কে ও বলেছিলাম, কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই  আর তোমাকে দেখতে পাইনি কলেজে | লিলি, আর কেয়া কে তোমার কথা জিজ্ঞাসা করেছিলাম কিন্তু ওরা ঠিক বলতে পারেনি, শুধু বলেছিল বাড়ি থেকে অসুবিধা আছে, তাই কলেজে আসতে পারবে না | তোমাকে খোজার অনেক চেষ্টা করেছিলাম, বন্ধুবান্ধবের কাছে তোমার বাড়ির ঠিকানা জিজ্ঞাসা করলে কেউ তেমন ভাবে বলতে পারেনি  | একজন দিয়েছিল তোমাদের বাড়ির ঠিকানা, সেখানে গিয়ে তোমাদের কথা জিজ্ঞাসা করেছিলাম,সেখানে একজন বলেছিল তোমরা নাকি বাসা বদল করে অন্য কোথাও চলে গেছো | তোমাদের নতুন বাড়ির ঠিকানা তার জানা নেই | ভেবেছিলাম কোনোদিন তোমার সাথে আর দেখা হবে না, কোনদিন তোমার সঙ্গে পরিচয় হবে না | অন্তরা এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাচ্ছিল  | আমি  যখন ওর কথাগুলো ওকে বলছিলাম  ও কোন প্রশ্ন করে নি আমাকে, সে মনে মনে কি ভাবছিলে কে জানে | কিন্তু আমি যখন ওর কথাগুলো বলছিলাম, তখন যেন কেমন বড় বড় নিঃশ্বাস পড়ছিল তার | 


আজও কোনো কথা বলেনি অন্তরা | জেঠিমা তাকে ডেকে নিয়ে পাশের ঘরে গেল | আর আমাকে বলে গেল অন্তরা তার মাসতুতো বোনের মেয়ে, প্রায় তিন মাস আগে বিধবা হয়েছে | এখন শ্বশুর বাড়িতে তার কোনো স্থান নেই, তাই নিরুপায় হয়ে ছুটে এসেছে আমার কাছে | ছোট বেলা থেকে মামার বাড়িতে  মানুষ, এখন সেখানে ও তার কোনো ঠাঁই  নাই | এখন থেকে অন্তরা আমাদের বাড়িতেই থাকবে | অন্তরার নামটা আমি আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে জেনে ছিলাম, তাই তার নাম ধরে ডাকতে আজ আর কোনো অসুবিধা হলো না | আজ থেকে আমি অন্তরার সঙ্গে সরল ভাবে কথা বলতে পাব | এ যেন ভাবতেই ভালো লাগছিল  আমার আর কোন ভয় সঙ্কোচ রইবেনা কথা বলতে  | আমি কত খুঁজেছি মনে মনে অন্তরা কে, কিন্তু পাইনি |


  আজ অন্তরা আমার বাড়িতে, আমার কত কাছে | আমি যেন  নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছি না | কিন্তু অন্তরা আমার ঘর থেকে চলে যাওয়ার পর মনের মধ্যে কিছু অজানা প্রশ্ন তোলপাড় করে উঠলো সাথে সাথে জানতে ইচ্ছে করলো কি হয়েছিল তার,  কেন সে কলেজ ছেড়েছিল | কখন তার বিয়ে হয়েছিল, তাঁর কোন সন্তান আছে কিনা তার স্বামী কেমন ছিল | শ্বশুর বাড়িতে এখন তার কোন ঠাঁই হবে না কেন ?


কিন্তু এখনই এসব প্রশ্ন করা কি ঠিক হবে, তাই কিছুদিন অপেক্ষা করলাম  | প্রায় মাস খানেক এইভাবেই কেটে যায় | অন্তরা আমার এত কাছাকাছি থাকা সত্বেও তার দেখা পাওয়া যায়না না বললেই চলে | সকাল বেলায় চান শেরে তুলসী তলায় পুজো দেয়া, আর সন্ধ্যা প্রদীপ দেয়া ছাড়া তাকে আমি দেখতেই  পেতাম না | আমি এবার একটু ধৈর্য হারিয়ে ফেললাম, জেঠিমাকে জিজ্ঞেস করলাম অন্তরার কি হয়েছিল ? কখন তার বিয়ে হয়েছিল? কার সাথে বিয়ে হয়েছিল? কেনই বা তাকে তাড়িয়ে দিল? এতসব প্রশ্ন করা দেখে জেঠিমা বললে ও পরে বলবো খন বাবা |


 আমি বললাম, আজকে তোমাকে বলতেই হবে জেঠিমা? | রোজ তুমি আমার কথা এড়িয়ে যাচ্ছো? অন্তরা এই বাড়িতে থাকা সত্বেও আমি তাকে দেখি না বললেই চলে | তাছাড়া সে আমাদের সাথে বসে খায়না কেন | গতকালই তো দেখলাম,  রান্নাঘরে মেঝেতে বসে একটা কলা পাতায় চারটি সাদা ভাত একটা সিদ্ধ আলু আর পাশে একটু  নুন রাখা আছে | আর সেটাই সে খাচ্ছে | কেন জেঠিমা ? কেন এসব? আর তাছাড়া তার বয়স ই বা কি হয়েছে ? বিধবা হলে মাছ মাংস কেন খেতে নেই  জেঠিমা ? তুমি মরলে জেঠু এসব পালন করত ? তবে শুধু মেয়েদের জন্যই কেন এতসব নিয়ম কানুন? তোমাকেও আমি কতবার করে বলি আমার সাথে বসে খাও, আমাকে তুমি কতো ভালো ভালো খাবার খাওয়াও মাছ, মাংস, ডিম, দুধ বল এসব না খেলে আমার শরীর টিকবে না | কিন্তু তুমি সেই  সেদ্ধ ভাত আর আলু সেদ্ধ আমার কথা শুনে জেঠিমার চোখে জল এলো, কাপড়ের আঁচলটা দিয়ে মুখটা মুছে নিয়ে বললে | মেয়েরা যে এভাবেই সব পালন করে এসেছে বাবা মেয়েদের সিঁথির সিঁদুর না থাকলে যে আর কিছুই রইল না তাদের | জিজ্ঞাসা করলাম সিঁথির  সিঁদুর এর সাথে খাবারের কি সম্পর্ক ? না খেয়ে শরীর খারাপ করাটা কি খুবই বুদ্ধিমান এর কথা ? বললে অতশত জানি না বাবা, তবে তুই যেটা জানতে চাস মানে অন্তরার কথা সেটা আগে বলি শোন |


   আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগের কথা তুই তখন মাত্র দু'বছরের, আমি আর তোর জেঠু একবার দক্ষিণেশ্বরের গিয়েছিলাম তোকে নিয়ে | তুই মাঝে মাঝেই কেমন একটু জ্বরে ভুগ  দিস তাই |সেখানে আমার দেখা হয় গায়েত্রীর সাথে, মানে দিয়ার মায়ের সাথে, সেও সেখানে এসেছিল একটা মানতের পুজো দিতে | তখন দিয়া পেটে, আমি গায়ত্রী কে মানে দিয়ার মাকে বলেছিলাম তোর মেয়ে হলে আমার আকাশের সাথে মানে তোর সাথে বিয়ে দেব  | গায়ত্রী আমাকে কথা দিয়েছিল, কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস  দিয়ার জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই গায়েত্রীর মৃত্যু হয় | গায়েত্রীর স্বামী জমিদারের ছেলে, বাবা-মায়ের অমতে বিয়ে করেছিল | গায়ত্রী যখন মারা গেল, দিয়া তখন মাত্র দুই মাসের, আমি কথাটা শুনতে পাই প্রায় বছর খানেক পরে | বিজয় নগর থেকে শিবপুরে এসেছি, তোর জেঠু এখানে একটা কাঠের মিল কিনেছিল এখানে তোর জেঠুর সাথে একজনের পরিচয় হয়, তার কাছ থেকেই খবরটা পাই,যে গায়েত্রীর মৃত্যুর পর এখন দিয়া মামার কাছে নন্দীগ্রামে থাকে |


 বাবা আবার বিয়ে করেছে | গায়েত্রী আর আমার কথা অনুযায়ী আমি একবার আমার মামার বাড়ি গিয়ে কার্তিক এর সাথে দেখা করে তোর আর দিয়ার বিয়ের কথাটা পেড়ে ছিলাম | মনে আছে তোর ? তুই কলেজ থেকে ফিরে তোর বাবার লেখা একখানা চিঠি পেলি, তাতে লেখা ছিল তোর মায়ের শরীর খুব একটা ভালো যাচ্ছে না এসে একবার দেখে যা | আর তুই তারপরের দিনই বিজয়নগরে গেলি মায়ের সাথে দেখা করতে | আমি বুঝতে পেরেছিলাম সাবিত্রী মনে হয় এবার আর বাঁচবে না | তাই তোর জেঠুকে বলে অন্নপূর্ণা কে তোর জেঠুর কাছে রেখে, আমি নন্দীগ্রামে যাই তোদের বিয়েটা যেন তোর মা দেখে যেতে পারে এই ভেবেই গিয়েছিলাম | আমি তোদের বিয়ের কথাটা পাড়তেই  কার্তিকের স্ত্রী মানে দিয়ার মামি ভীষণ চটে যায় | তোর সাথে বিয়ে দেব না তুই আমার প্পোষ্য পুত্র,বাবা মাতাল,পাতালের ছেলের সাথে বিয়ে দেবে না |  তার ওপর আবার, চাকরি  নেই, জমিজমা নেই, আমি  বলেছিলাম আমার যা কিছু আছে ব্যবসা পত্র জমানো টাকা পয়সা সবই আমার আকাশের | কিন্তু তারা রাজি হয়নি | বলেছিল শোনো ঠাকুরজি আমরা গরিব হলে কি হবে | দিয়া তো আর গরিবের মেয়ে নয়, ও জমিদারের মেয়ে,জমিদারের রক্ত বইছে ওর শরীরে, আমি জমিদারের বাড়িতেই ওর বিয়ে দেবো | আমার চারটা মেয়ে, কিন্তু আমি দিয়াকে ভালো খাওয়াই ভালো জামা কাপড়  পড়াই তাছাড়া আরো বলেছিল যে | 


 অন্নপূর্ণা  বিয়ের পর এসে যদি সবকিছুর দাবী করে, তখনতো দিয়ার  কিছুই থাকবে না | তাছাড়া দিয়া সুন্দরী লেখাপড়া জানা মেয়ে, যে কোন ভালো ছেলে তাকে নিয়ে যাবে | আমি হাতে-পায়ে ধরে ছিলাম | আর বলেছিলাম ও আমার পোষ্য পুত্র নয় ও আমার ছেলে,আমার বড় ছেলে, আমাদের বিয়ের দশ বছরের মধ্যে কোন ছেলেমেয়ে হয়নি,আকাশের জন্মের দিন থেকেই আমি তাকে মানুষ করি | কারণ ওর মা তখন অসুস্থ | পরে আমি ওকে ঠাকুরপোর আর সাবিত্রীর কাছ থেকে  চেয়ে নিয়েছিলাম | তোরা সাত সাতটা ভাই বোন তুই সবার ছোট | তোর হওয়ার পর থেকেই তোর মা একটু অসুস্থ হয়ে পড়ে | আর তোর বাবা চাকরি করে যেটুকু রোজগার  করতো সেটুকু মদ আর জুয়াতে শেষ করে ফেলতো | আমাদের মানে তোর বাবা আর তোর জেঠুর যেটুকু জমি জমা ছিল সেটা তোর জেঠুই দেখাশোনা করতো | একদিন তোর বাবা তোর জেঠু কে বললে দাদা, তোমার তো কোন ছেলে মেয়ে নেই, জমি জমা দিয়ে তুমি কি করবে? তাছাড়া তোমার তো একটা কাঠের  কারখানা আছে তা দিয়েই তো তোমাদের ভালোভাবে চলে যাবে  |
জমিজমা গুলো বরং আমার নামে লিখে দাও তোর জেঠু সাথে সাথে তাকে তার ভাগ টা ও লিখে দিয়ে আমরা তোকে নিয়ে শিবপুরে চলে আসি | সেখানে তোর জেটু একটা কাঠের কারখানা কিনে রেখেছিল আগে থেকে নিতাই সেটা দেখাশোনা করতো | 


 তারপরে অন্নপূর্ণা আমার কোলে আসে, কিন্তু আমি তাদের বোঝাতে পারিনি | | তারপর আমি আর সে মুখ হয়নি দিয়ার বিয়ে হয়, তারা আমাকে নেমন্তন্ন করে চিঠি পাঠায়, আমি যায়নি | পরে শুনেছিলাম কার্তিকের স্ত্রী একটু ছল করে  তার বাপের গ্রামে এক জমিদারের বাড়িতে কিছু টাকা নিয়ে দিয়ার বিয়ে দেয়,  ছেলেটার আগে বিয়ে হয়েছিল বড় বড় ছেলে মেয়েও আছে | কলেজ ছাড়িয়ে কিছুদিন বাড়িতে রাখার পর তার বিয়ে দিয়ে দেয় |


ছেলে মেয়ে হয়নি, প্রায় জবরদস্তি  করেই সেখানে বিয়েতে রাজি করায় তাকে  | আর সেই টাকা দিয়ে তার বড় মেয়ে দুটোর ভালো বাড়িতে বিয়ে দেয় | মাস তিনেক আগে তার স্বামী মারা যায়, ছেলে মেয়ে নেই, বলে সেখানে তার কোনো স্থান ও নেই | তাছাড়া কার্তিকের আরো দুটো বড় মেয়ে আছে বিয়ে দিতে, তাদের খাওয়াবে না বিধবা ভাগ্নিকে দেখবে,এই নিয়ে কিছু কথাবার্তা হয় তাদের স্বামী-স্ত্রীতে | কার্তিক আমাদের ঠিকানাটা দিয়ে বলেছিল যে, তোর একটা  বিধবা মাসি আছে সেখানে গিয়ে দেখতে পারিস | তার নিজের একটা মেয়ে আছে বটে, তবে তার বিয়ে হয়ে গেছে, এখন তোর মাসি একাই থাকে  |তুই তার সাথে থাকলে বরং একটু তার সুবিধাই হবে | তোর কথা বলেনি | আর অন্য কিছু বলেনি, যদি সে জানতো যে আমি তোর সাথে বিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলাম হয়তো সে আসতো না | সেটা তারা বুঝেই তোর কথাটা বলেনি | সে যখন তার দুঃখের কথাগুলো আমাকে বলছিল আমি ও তখন বলে ফেলেছিলাম যে তুই আজ এই অবস্থায় এখানে এলি “মা,এই পোষাকে ! আমি তোকে আমার আকাশের বউ করে এই বাড়িতে আনতে চেয়েছিলাম | তোর মামী তা হতে দেয়নি | এই কথাটা শোনার পর থেকেই সে তোর সামনে আর আসতে চাইছে না | আর তাছাড়া তুই যে এখনো পর্যন্ত কারো অপেক্ষা করে বসে আছিস বিয়ে করিস না | এই কথাটা আমি তাকে জানাই, কিন্তু তুই তো কোন দিন আমাকে বললি না যে কার অপেক্ষায় আছিস কার জন্য তুই এখনো বিয়ে করিস না? | সেটা আমি তাকে জানিয়েছি | কলেজে কাকে তোর ভাল লেগেছিল তুমি তাকে বলতে পারিস নি, তোর মনের কথা | তারপর থেকেই তুই তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিস | তোকে কত ভালো ভালো মেয়েই না দেখালাম, কিন্তু তোকে এখনও বিয়ের জন্য রাজি করাতে পারিনি |


তারপর জেঠিমা আমার হাতটা নিজের হাতের উপর রেখে বললে, বলতো বাবা, আজ তোর মনের কথা, কাকে তুই খুঁজছিস এতদিন থেকে ? বললাম তুমি শুনলে বিশ্বাস করবে না জেঠিমা | তবে এটাই সত্য যে আমি কলেজে পড়া থেকে আজ পর্যন্ত অন্তরা কেই খুঁজছি | অনেক খুঁজেছি মনে, মনে কিন্তু কোথাও পাইনি | তাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করা আমার পক্ষে অসম্ভব জেঠিমা  ? আমার কথা শুনে জেঠিমার চোখ দুটো যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল বললে “পারবি বাবা ? এখন তাকে বিয়ে করতে ? বললাম কেন পারবোনা জেঠিমা |


তারপরেই জিজ্ঞেস করলাম, জেঠিমা তোমার সমাজের ভয়ে নেই ? বললে আছে বৈকি বাবা, তবে সমাজের ভয় করে যদি ঠিক কাজটা না করে যায়, তবে সেটাও যে পাপ হবে বাবা | তারপরেই  জেঠিমা আমার হাত ধরে উঠানে তুলসী গাছটার কাছে  নিয়ে গিয়ে বললে, আমি তো তেমন  লেখাপড়া জানি না বাবা, তবে তোকে একটা প্রশ্ন করছি বলতো এই গাছটা কেন বেঁচে আছে  ? তার সবুজ পাতা দেখলে কেন এত সুন্দর লাগে  মনটা,এই গাছের ফুল পাতা এত সুগন্ধি কেন? বললাম কেন জেঠিমা ? বললে  আমরা এই গাছে রোজ জলদি বাবা, আর সূর্যের আলো পড়ে তাইতো গাছটা এত সুন্দর হয়ে উঠেছে, তা না হলে আস্তে আস্তে একদিন শুকিয়ে যাবে, তাতে আর সবুজ পাতা বেরবে না, বুঝতে পারলাম জেঠিমা কি বলতে চাইছেন | তবুও জিজ্ঞেস করলাম যদি তোমার ভগবান জিজ্ঞাসা করে কেন তুমি বিধবা মেয়ের বিয়ে দিলে ? বললে ভগবানকে বলবো, ভগবান সবই তো তোমার সৃষ্টি,  সবই তোমার ইচ্ছে | রাত্রে প্রদীপের আলোয়, আর দিনের সূর্যের আলোয় চোখের জল সবাই তো দেখতে পায়, কিন্তু রাত্রে বিছানায় শুয়ে মুখে বালিশ চাপা দিয়ে নিঃশব্দে ব্যথা ভরা কান্নার আওয়াজ  যে শুধু মায়েরই চোখে পড়ে  ভগবান,| তাই আমি শুধু ওদের একটু খুশি হবার রাস্তা দেখিয়ে এসেছি | আর আমার উঠোনের তুলসী গাছটা জলের অভাবে যেন শুকিয়ে না যায়, গাছটা যেন সব সময় সবুজ পাতা  আর ফুলের সুগন্ধে আমার বাড়ির উঠোনটা যেন চিরদিন  ভরে থাকে এটুকুই তো শুধু চেয়েছি ভগবান |


অন্তরা তার ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল হয়তো, জানালার পাল্লাটা আধা খোলা | হয়তো আমাদের কথা গুলো শুনতে পেয়েছে, দেখলাম একটু আড়াল হয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছলো |

  





সমাপ্ত 


Sai Antara

Comments






Mohammad Bari

2021-02-25 00:00:00

nice

Mohammad Bari

2021-02-25 00:00:00

fantastic

Mohammad Bari

2021-02-25 00:00:00

fantastic continue

Mohammad Bari

2021-02-25 00:00:00

Fantastic continue