Article

পরী

April 08, 2021

মার নাম পারমিতা রায় | সবাই আমাকে “পরী, বলে ডাকে, পাঁচ বোনের ছোট বোন আমি | সবাই বলে আমি নাকি আমার চার বোনের থেকে দেখতে একদম আলাদা, আমার গায়ের রং দুধের মত সাদা, কেউ কেউ আবার বলে, আমি নাকি আমার গায়ের রংটা  আমার ঠাকুরমার কাছ থেকে পেয়েছি | আমার চোখের মণি নীল, চোখের ভ্রু জোড়া বেশ সুন্দর, চোখের পাপড়ি গুলো ঘন কাল আর বড় বড়, মাথার চুল আর অন্য দিদিদের মতো কালো বা বাদামি নয় | একেবারে কোঁকড়ানো সোনালী রেশমি এই  কোমর পর্যন্ত আমার চুল | সবমিলিয়ে আমাকে সবাই বলতো আমি নাকি সত্যি কারের পরী |


আমার বাবারা তিন ভাই, আমার বাবা মেজ, দেব শংকর রায় | আমার জেঠু শিব শংকর রায়, ছোটকাকু দেবাংশু রায় | আমাদের জমিজমা বলতে আমাদের গ্রামের দক্ষিনে যে বড় পুকুর টা আছে তার লাগাই পাঁচ বিঘা ধানি জমি | আর এক জোড়া বলদ, বাবা নিজেই জমিতে চাষ বাস ,তাথেকে কিছু ধান  কিছু রবি ফসল আসতো, আর বাবার একটা মুদিখানার দোকানও ছিল, সেখান থেকেই আমাদের মোটামুটি চলে যেত | 


আমার জেঠু শিব শংকর রায় | গ্রামের মস্ত বড় জমিদার, অনেক সম্পত্তি ,বিরাট বাড়ি-গাড়ি চাকর-বাকর সেই যুগে বিরাট দামি মোটর গাড়ি | ইংল্যান্ড থেকে সাহেবরা, মেম সাহেবেরা, এসে থাকতো জেঠু দের বাড়িতে | অবশ্য এতসব সম্পত্তি জেঠু নিজে করেনি, জেঠিমার বাবার | জেঠিমা বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে, আর জেঠু ঘরজামাই, সেই সূত্রেই জেঠিমার সব সম্পত্তি জেঠুর নামে লিখে দেন | জেঠুর চার ছেলে |


আর ছোটকাকু দেবাংশ রায়, পেশায় ডাক্তার | কাকুর এক ছেলে, এক মেয়ে, বাইরে কোথায় যেন দূর দেশে থাকত তখন, বাবা আর জেঠু যখন গল্প করতো কাকুর কথা, তখনই শুনতাম | আমি কাকুকে চোখে দেখিনি, তবে শুনেছিলাম উনি নাকি বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন কি কারনে সে জানতাম না |


জেঠিমার মেয়ে ছিল না, পরপর চারটা ছেলে, জেঠিমার খুব শখ ছিল মেয়ের, কিন্তু হয়নি | পরপর চারটি ছেলে | জেঠিমা দের  বাড়ি আমাদের গ্রামের শেষ প্রান্তে | গ্রামের দুর্গাপূজা জেঠিমা দের জমিদার বাড়িতেই হত | আমরা সবাই মিলে পুজোর দিন গুলি জেঠিমা দের বাড়িতেই কাটাতাম | এমনি একবার পুজোর সময়, তখন আমি ছয় কিংবা সাত আমার খুব ভাল করে মনে আছে | জেঠু আর জেঠিমা আমাদের বাড়ি এসেছেন বাবা-মাকে কি যেন বলছে, মা তাঁদের কথা শুনে আঁচল দিয়ে চোখের জল মুচ্ছে, আর বাবার মনটা খুব একটা খারাপ দেখিনি | আমার দিদিরা সবাই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জেঠু আর জেঠিমার দিকে |


জেঠিমা আমাকে ডেকে আদর করে কাছে নিয়ে তাঁর কোলে বসিয়ে বললে, এখন থেকে আমার পারমিতা মা সব সময় আমার কাছেই থাকবে, আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না | দিদিদের জিজ্ঞাসা করলাম কেনরে দিদি মা কাঁদছে ? জেঠিমা বলছে আমি সবসময়ই জেঠিমার কাছে থাকবো | দিদিরা সবাই আমাকে বলে উঠল “পরী, তুই এখন থেকে জেঠিমার মেয়ে, বুঝতে পারলাম না, বললাম সে আবার কি কথা ? আমি জেঠু জেঠিমা দের মেয়ে হতে যাবো কেন ? | দিদিরা সবাই বললে পরী তুই ভাগ্য করে এসেছিস, তুই এখন থেকে জেঠিমা দের জমিদার বাড়িতে থাকবি | তোকে তাঁরা নিজেদের মেয়ে করে নিয়ে যাবে, তাই মা একটু কাঁদছে | কিন্তু এইতো ও পাড়া শেষেই জেঠু দের বাড়ি তুইতো ইচ্ছে করলে এখানে আসতে পারবি |পরেরদিন জেঠু এসে আমাকে নিয়ে গেল, আমার জামা কাপড় কিছুই সাথে নিতে দিল না | আমার খেলার পুতুল টা হাতে নিতেই বড়দি বলে উঠল “পরী, এসব খেলনা ওই বাড়িতে মানাবে না, নিয়ে যাস না, তোর কত নতুন নতুন জামাকাপড় হবে, খেলনা হবে, আমি আমার হাতের পুতুল টা বাড়িয়ে দেওয়ার উপর রেখে এনাম | গাড়িটা জেঠু দের জমিদার বাড়ির গেটে ঢুকতেই দেখলাম কি সুন্দর করে বাড়িটা সাজানো হয়েছে,রং বিরাঙ্গী লাইট দিয়ে, ফুল দিয়ে, দাদারা ছুটে এল গাড়ির কাছে | আর একজন লোক গাড়ির পিছনের দরজাটা খুলে দিল, জেঠু আমার হাত ধরে গাড়ি থেকে নামালো | সবাই মিলে আদরের সাথে আমাকে বাড়ীর ভেতরে নিয়ে গেল | 


কিছুদিনের মধ্যেই আমি হয়ে উঠলাম চার ভাইয়ের আদরের ছোট বোন, জেঠু আর জেঠিমার আদরের একমাত্র মেয়ে | আর বাড়ির চাকর বাকর এদের কাছে তাঁদের ছোট মেম সাহেব, দামি দামি পোশাক, দামি খেলনা, চোখ ধাঁধানো সব জিনিসপত্র আনতে থাকলো দেশ-বিদেশ থেকে আমি বড় হতে থাকলাম সবার মাঝে |


কৈশোর থেকে যৌবনে পা দিলাম, আমার রূপ টা যেন আরো বেড়ে গেল, যে একবার আমাকে দেখতো দেখেই থাকতো | আর আমার রূপের চর্চা, আর আমার ব্যবহারে সবাই মুখরিত হয়ে উঠলো | আমিও নিজেকে আয়নায় দেখে মুগ্ধ হতাম  | পড়াশোনা বলতে জেঠু বাড়িতেই মাস্টারমশাই রেখেছিল বাইরে স্কুল-কলেজে গেলে আমার উপর কারও নজর পড়তে পারে, তাই জেঠু স্কুলে পাঠান নি |


আস্তে আস্তে আমার সব দিদিদের বিয়ে হয়ে গেল | এইদিকে দাদাদের দুজনের বিয়ে হয়েছে, আমার বিয়ের কথা উঠল | আমি ইতিমধ্যেই প্রেমে পড়েছি জেঠুর এক বিদেশী বন্ধু মিস্টার রবার্ট এর ছেলে ডেভিডের প্রেমে | জেঠু আর জেঠিমার তা বুঝতে বাকি রইল না | একদিন রাত্রে জেঠিমা আর জেঠু আমার ঘরে এসে বসলো | জেঠিমা আমার ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল ,যাতে করে বাড়ির লোক বা আর অন্য কোন লোক যেন জানতে না পারে |


জেঠিমা আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললে “মা, বিদেশীরা বন্ধু প্রজন্তই ঠিক আছে,তাঁরা আত্মীয়তা করার মতন নয় | তাঁরা ভালো বন্ধু হতে পারে, ভালো স্বামী হয়ে উঠতে পারে না | তাঁদের একটা স্ত্রী বাড়িতে থাকে আসবাবপত্রের মতো | আর বাইরে থাকে আরো দুজন মনোরঞ্জনের জন্য | রাত্রে বিছানার সাথী তাঁরা করে, কিন্তু মনের সাথি মান-অভিমানের সাথী তাঁরা করতে পারেনা | তাছাড়া আমরা ভারতীয় নারী, ওসব আমাদের সইবে কেন ? স্বামীর সোহাগে বেঁচে থাকা, ছেলে মেয়ে স্বামী নিয়ে সুখে দুঃখে একসাথে থেকে সংসার করা এটার নামই যে জীবন,মন না চাইলেও জেঠিমার কথাগুলো সব বিশ্বাস করলাম |


জেঠু বললে, তোমার আমরা বিয়ে ঠিক করেছি মা, এক বিরাট বড় লোকের ছেলের সাথে | ছেলেটা দেখতে রাজপুত্রের মত সুন্দর, তোমার সাথে খুব মানাবে | শিক্ষিত ও কম নয়, বিলাত থেকে ডাক্তারি পাশ করে এসেছে | তবে সে ডাক্তারি পয়সার জন্য করে না, এমনিতেই তাদের অনেক সম্পত্তি জমি-জমা কলকারখানা তুমি সেখানেও রানী হয়ে থাকবে | স্বামীর আদরের হয়ে থাকবে |  মাত্র দুই ছেলে তাদের বাবা গত হয়েছেন বেশ কয়েক বছর আগে, মা আছেন, বাড়িতে চাকর বাকর এর অভাব নেই |


জেঠু জেঠিমা দাদা বৌদিদের কথায় বিয়েতে রাজী হয়ে গেলাম | আমার বিয়ে হলো, একেবারে রাজকন্যার মত | পাড়ার সবাই বলতে লাগল তাঁরা নাকি জীবনে  কখনো এমন বিয়ে বা এমন জুটি দেখেনি, ভগবান যেন তাদের দুজনকে নিজের হাতে বানিয়েছে, স্বর্গের দেব দেবীর মত | আমার দিদিদের বিয়ে হয়েছে সাধারণ পরিবারে তাঁরাও সব ছেলে মেয়ে স্বামী নিয়ে এসেছে আমার বিয়েতে, দিদিরা বললে তুই কি ভাগ্য করে এসেছিস রে পরী ? বাবা-মা ও চোখ মুছতে মুছতে বলেছিল তুই খুব ভাগ্যবতী রে “মা, কুড়ে ঘর থেকে উঠে এসে এত বড় ঘরে রাজকন্যা হয়ে মানুষ হয়েছিস এবার রাজবধূ হয়ে থাকবি |


সবাই যখন এতো করে বলছিল আমিও তখন একটু খুশি হয়ে মনে করেছিলাম হবে হয়তো | আমার বিয়ে হয়ে গেল, খুব জাকজমকের সাথে | আমি শ্বশুর বাড়ি এলাম, শাশুড়ি আমাকে বরন করে খুব আদরের সাথে বাড়ির ভিতর নিয়ে গেল | বাড়িতে অনেক কাজের লোক | সবাই আমার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকাচ্ছিলো তবে আমি খেয়াল করে দেখেছিলাম  সিঁড়ির কনে যে ঘরটা, তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলএকজন মাছ বয়স্ক মহিলা,আমার মনে হয়েছিল আমাকে দেখে সে যেন তেমন খুশি হয়নি | বাড়িতে সব দামি দামি  আসবাবপত্র আমি বাড়ির ভেতর ঢুকতেই সবাই বললে, ঘরে লক্ষী এল | আমার রূপের চর্চা সেখানেও শুরু হলো | আমার দেবার আমাকে দেখে বললে, এত সুন্দরী সে জীবনেও কখনো কাউকে দেখেনি | প্রথম বৌদি তোমার ধারে কাছেও আসতে পারবেনা | কথাটা সেদিন আমি ঠিক বুঝতে পারিনি | 


আমাকে সবাই মিলে আমার ঘরে নিয়ে গেল, আমাকে ফুলশয্যার ফুল বিছানো খাটে বসিয়ে দিয়ে সবাই নিচে চলে গেল, আমি বসে আছি ঘুমটা দিয়ে, আমার বর ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে আমার পাশে এসে বসল | আমার ঘুমটা একটু সরিয়ে ডান হাত দিয়ে আমার মুখটা তুলে ধরে কিছুক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপরে বলে উঠলো পারমিতা তুমি সত্যি অপরূপা | আমি তোমাকে দেখিনি, মায়ের কাছে তোমার রূপের চর্চা আর তোমার গুণের কথা শুনেই তোমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যায় |


তোমার চোখ দুটো যেন নীলসাগর,  তোমার ঠোঁট দুটো লাল গোলাপের পাপড়ি,তোমার এত রূপ চাঁদ তোমাকে দেখলে নিজে লজ্জা পাবে | তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে কোন এক গল্পের রাজকন্যা ,আমার পাশে বসে আছে, আমি এত ভাগ্যবান আগে বুঝিনি | আমি তোমাকে ছেড়ে কোনদিন কোথাও যাবনা তুমিও আমাকে ছেড়ে কোনদিন কোথাও যেও না | এমনকি তোমার বাবার বাড়ি জেঠুর বাড়ি কোথাও না,আমি তাকে কথা দিয়েছিলাম তোমাকে ছেড়ে কোনদিন কোথাও যাবো না | আমার রূপের কথা সবার মুখে শুনেছি কিন্তু সেই ফুলশয্যার রাতে স্বামীর মুখ থেকে শুনতে খুব ভাল লেগেছিল | আমি কিছুদিনের মধ্যেই শ্বশুরবাড়িতে সত্তিকারের রানী হয়ে উঠলাম | কেউ যেন মাটিতে পা ফেলতে দেইনা, কোন কাজে হাত দিতে দেয় না ,আমার নিজের কাজের মেয়ে প্রায় আট দশজন আমার গোসল করার পানিতে গোলাপের পাপড়ি মেশানো  | গয়না পরিয়ে দেওয়ার জন্য, চুল বেঁধে দেয়ার জন্য, কখন কি লাগবে তার জন্য, আলাদা আলাদা লোক | বছর কাটল এইভাবে, বিয়ের পর প্রথম পূজা জেঠু লোক পাঠিয়ে জামাই মেয়েকে নিতে পাঠিয়েছে এটা আমাদের গ্রামের নিয়ম, বিয়ের পর জামাই মেয়ে প্রথম পুজো বাপের বাড়িতে করবে | আমি আর আমার বর জেঠু দের বাড়ি গেলাম | সেইবার আমার দিদিরা ও সবাই এসেছিল আমাকে দেখবে বলে | তাঁদের দুটো তিনটে ছেলে মেয়ে | দাদা দের ও বাচ্চা হয়েছে | মা-বাবা গ্রামের লোক সবাই আমাদের দেখে খুব খুশি দুর্গাপূজা টা খুব আনন্দে কাটলো আমরা পুজোটা কাটিয়ে এবার বাড়ি ফিরব, মা মানে আমার জেঠিমা আমার হাত ধরে বললে, সামনে পুজোয় যেন কোলে নাতি নাতনি দেখি |


জেঠিমার কথাটা শুনে কেমন যেন অদ্ভুত রকমের আমার ভালো লাগলো, কোলে যেন নাতি-নাতনি দেখি | আমি সারা রাস্তাটায় জেঠিমার কথাটা ভাবতে ভাবতে এলাম | পরের দিন রাত্রে আমি আমার বরকে বললাম জেঠিমার কথাটা | আমার বরের কাছে থেকে কোন উত্তর পেলাম না | তারপর থেকে প্রায় বলতে আরম্ভ করলাম, আমার দিদিদের কথা বললাম | আমার দিদিদের কথা বলতেই বললে, তোমার রূপ তোমার শরীর তোমার দিদিদের মতো নয়, বাচ্চা হলে শরীরের গঠন খারাপ হয়ে যাবে, রুপো তেমন থাকবে না, আমি তোমাকে এই রকমই দেখতে চাই সুন্দরী দেখতে চাই সবসময় |


কথাটা শুনে মনটা খারাপ হলো | তারপর থেকে যখনই বলতাম তখুনি আমাকে একই উত্তর দিত | এভাবে আরো বছর খানেক কাটলো | পুজো এলো, পুজো গেল, কোন কিছুতেই যেন আর মন দিতে পারছিলাম না | আমাকে অবশ্য বলেছিল যদি জেঠুর বাড়িতে যেতে চাও যেতে পারো | আমারও কিছু কাজ আছে একটু বাইরে যেতে হবে, এই মাস খানেকের জন্য | আমি কিছু বললাম না, সে চলে গেল | যাবার সময় শুধু একটা কথা বলে গেল, আস্তে দেরিও হতে পারে চিন্তা করোনা |


আমার পথ চাওয়ার দিন শুরু হল | আর কিছুদিন যেতে না যেতেই আমার শাশুড়ির গঞ্জনা ও শুরু হলো | কথায় কথায় বলতে লাগলো এত রূপ কিসের কাজের, যে স্বামী কে আটকে রাখতে পারে না, নিজের কাছে | এখন পর্যন্ত নাতি নাতনি কোলে  নিতে পেলাম না | এত রূপ গুন কি কাজের | আমি তোমার রুপ দেখে তোমার গুনের কথা শুনে, আমার ছেলের সাথে তোমার বিয়ে দিয়েছিলাম, যাতে করে তুমি তাকে ধরে রাখতে পারো | আর আমার ছেলে আমার কাছে থাকে, কিন্তু কোনটাই তো হলোনা | এতসব দেখে, আমার মন খারাপ দেখে, আমার দেবার তখন সুযোগের সৎ ব্যবহার করতে এতোটুকু দেরী করলো না | রোজ কাজ থেকে এসে আমার ঘরে বসে গল্প করতে লাগল, প্রথম প্রথম ভাবতাম হয়তো আমার মন খারাপ দেখে তার খারাপ লাগে বলে সে বুঝি আমার সাথে গল্প করতে আসে | যাতে করে আমার মনটা ভালো থাকে, কিন্তু কিছুদিন পর থেকে দেখলাম কাজে তেমন তার আর মন নেই, সব সময় যেন আমার দিকেই তার লক্ষ্য, আমার রূপের কথা তার মুখ থেকে যেন ঝরে চলেছে | আমার শরীর আমার যৌবন নিয়ে তার যত মাথাব্যথা | বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তার আসল রূপ ধরা পড়ল, একদিন পিছন থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললে, আমার রূপ যৌবন নাকি তাকে পাগল করে তুলেছে | দেবরের কাছ থেকে কথাটা শুনে আমি আমাদের ঘরের সামনের দরজায় খিল দিলাম | যাতে করে আমার ঘর থেকে তার ঘরটা দেখা না যায় | পাছে তার মায়াজালে  পড়ে আমিও নিজেকে না হারিয়ে ফেলি | ইতিমধ্যেই বাড়িতেও চাকর-বাকর বলতে শুরু করেছে আমি নাকি সবাইকে রুপে পাগল করি তাই দেবরকে ও তা থেকে নিস্তার দিলাম না | নীল সাগরের মতো চোখ আমার আর নেই, কাঁদতে কাঁদতে মনে হচ্ছে সাদা ছানি পড়েছে, চোখে এখন তেমন আর ভালো দেখতে পাইনা ,লাল গোলাপের পাপড়ির মত ঠোঁট কালো হয়ে এসেছে, চোখের কোণে কালি, চুলে জট পড়েছে এইসব দুর্গা পিসি আমাকে বলেন |


আজ কুড়ি বছর আমার ঘরের সদর দরজা বন্ধ | কতদিন ছেড়ে দিয়েছি আয়না দেখা, কাজের লোক আস্তে আস্তে সবাই আমার ঘরে আসা বন্ধ করেছে ,শুধু আমার দূর্গা পিসি শাশুড়ি দুবেলা আমার ঘরে আসেন, আমার খাবার দিতে, দুর্গা পিসির বয়স হয়েছে,সিঁড়ি দিয়ে উঠে আমার ঘরে আসতে তাঁঁর ভারী কষ্ট  হয় ,তবুও তিনি আসেন | একদিন দুর্গা পিসিমা  চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন বৌমা যেদিন তুমি প্রথম আমাদের বাড়িতে বউ হয়েএলে, তোমার সাগরের মতো নীল চোখ দেখে তোমার রুপ দেখে সবাই খুব খুশী হয়েছিল, আমি হতে পারিনি | তুমিও আমার দিকে কেমন যেন একটু নজরে তাকিয়েছিলে বুঝেছিলাম, কিন্তু তবু খুশি হতে পারেনি | আমি জানতাম তোমার এই নীল সাগরে  একদিন  সাদা চর পড়বে চোখে আর জল থাকবেনা তোমার রূপ বেশিদিন টিকবে না | একদিন শেষ হয়ে যাবে | তোমাকে কেউ দেখবে না, আমিতো জানি এই বাড়ির সব ঘটনা, এতদিন তোমাকে বলতে পারিনি | বৌদির ভয়ে, আজ আমার কোন ভয় নেই তোমাকে বলতে,  তুমি যার জন্য অপেক্ষা করে আছো সে কোনদিন তোমার ছিল না বৌমা | আর সে কোনোদিন তোমার হবে না, সেটাও আমি জানতাম | তার যে আরো অন্য একটা বিদেশি বউ আছে, | আর বৌ থাকা স্বত্তেও অন্য মেয়ে মানুষের কাছে সে যেতো একটা নয়, কতটা যেহবে আজ পর্যন্ত তা ঠিক নেই | তার একটা আগের পক্ষের মেয়েও আছে শুনেছি, কোনদিন তাকে চোখে দেখিনি, বৌদি এই বাড়িতে তাকে ঢুকতে দেয়নি | আমি তো জানতাম কেন বিয়ে করছে | যখন দেশে ফিরে আসবে তার বিছানার সাথী যেন কেউ থাকে | পিসি শাশুড়ির কথাগুলো শুনে জেঠিমার কথা মনে পড়ে গেল, জেঠিমা বলেছিল বিদেশীরা শুধু বিছানার সাথী করে, ভালো স্বামী হয়ে উঠতে পারে না | স্বামীর কর্তব্য করতে পারেনা | আজ কাল জানালার সামনে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে বাইরে দেখে থাকি, অনেকদূর পর্যন্ত দেখার চেষ্টা করি কিন্তু হয়, না পারিনা, কারণ চোখে তেমন আর ভালো দেখি না | তবুও তার পথ চেয়ে জানালার সামনে আজ ও দাঁড়িয়ে থাকি, আর  ভাবি কোনটা ঠিক, যেটা জেঠিমা বলেছিল না যেটা  মা বলেছিল যে আমি খুব ভাগ্যবতী | তার কোনটাই কি হল, আমার এত রূপ দিয়ে, এত ধন-সম্পত্তি দিয়ে কি হলো | সবাই বলেছিল আমি রূপবতী আমি বড় ঘরে লালন-পালন হয়েছি বড় ঘরে বিয়ে হয়েছে খুব সুখে থাকবো, মনে মনে হাসলাম সত্যি কি তাই, সুখ কি শুধু রূপ আর ধনসম্পত্তি থাকলেই হয়, এখন আর তা মানিনা, তবুও আশা করি সে আসবে তাকে আসতেই হবে আমার কাছে |


না, সে এখনো এলো না, কত বছর তো কেটে গেল, বাবা-মা জেঠু জেঠিমা এমনকি আমার শাশুড়ি ও আর বেঁচে নেই | শুনেছি দাদারাও নিজেদের সম্পত্তি ভাগাভাগি করে আলাদা হয়েছে | এত বছরেও কেউ আমাকে একবার দেখতে আসেনি ভেবেছে হয়তো আমি বড় লোকের ঘরের বউ ভালোই আছি | একবার ছোট কাকু এসেছিল সেও অনেক বছর আগে, আমাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু স্বামীকে কথা দিয়েছিলাম তাকে ছেড়ে এ বাড়ি ছেড়ে কোথাও কখনো একা যাব না | কিন্তু এখন মনে হচ্ছে হয়তো তাঁকে না দেখে তাঁর কাছ থেকে বিদায় না নিয়েই আমাকে চলে যেতে হবে | তবে সবকিছুর জন্য এখন দিন গুনা ছেড়ে দিয়েছি, বিছানা থেকে উঠতে পারিনা, পিসিমা মারা যাওয়ার আগে একজনকে বহাল করেছিল আমার দেখাশোনা করার জন্য | পিসিমার কাছে শুনতাম আমার দেওয়ারও অনেকদিন বাড়ি ছাড়া, তাই এই বাড়িতে আর কেউ থাকে না | এখন একটা না দুইটা কাজের  মেয়ে আছে বাড়িতে, তাদের মধ্যে একজন এখন একটু আমার কাজ করে দেয় | আমি কত বছর শয্যাশায়ী তবু মাঝে মাঝে আবছা দৃষ্টিতে সদর দরজার দিকে তাকাই হয়তো হঠাৎ করে দরজাটা খুলে যাবে, আমার স্বামী আমার মাথার পাশে এসে বসবে  পরী বলে আমাকে জড়িয়ে ধরবে, আমি তাকে আমার দুহাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে শেষবারের মতো কাঁদবো | বলব এ আমার সুখের কান্না | যাওয়ার আগে তোমাকে একটিবার দেখতে চেয়েছিলাম, বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিলাম, আমার সেই আশা আজ পূরণ হয়েছে | আমি তোমাকে কথা দিয়েছিলাম তোমাকে ছেড়ে কোথাও কখনো যাবনা | কিন্তু হয়ত আর কথাটা রাখতে পারলাম না, আমায় ক্ষমা করো | আমার যে সময় হয়েছে তোমার কাছ থেকে বিদায় নেবার |


বিছানায় শুয়ে আমি কথাগুলো ভাবতাম | আমার চোখে ঘুম নেই অনেক বছর, তবুও বিছানায় শুয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে কথাগুলো ভাবতাম | সেদিনও ঠিক এমনি করেই আমার চোখ দুটো বন্ধ করেছিলাম হঠাৎ মনে হলো কে যেন আমার কপালে তাঁর ঠোঁটের হালকা ছোঁয়া দিল, খুব জোরে নড়ে ওঠার চেষ্টা করলাম | কিন্তু তেমন শক্তি ছিল না,বলে নড়তে পারলাম না,মনে করলাম চোখ দুটো খুলে দেখি তারপরে আবার মনে হল না থাক, হয়তো স্বপ্নে দেখছি | তবু ভালো লাগছে, মনে হচ্ছে আমার স্বামীর ছোঁয়া | তারপরে আমার ঠোঁটে তাঁর আঙ্গুল গুলো বলিয়ে দিল | তাঁর দুহাত দিয়ে আমার মুখটাই হাত বুলালো ভয়ে ভয়ে চোখ খুললাম, পরিষ্কার দেখতে পেলাম না | তবু তাঁর চোখের চাওনি দেখে আমি তাঁর দিকে একদৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম হ্যাঁ সে ফিরে এসেছে, আমি জানতাম যে আসবে | সে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদলো তাঁর কান্নায় আমার বুকের শাড়িটা ভিজে গেল, আমি তাঁর চোখ দুটো মুছে দিয়ে বললাম তুমি এসেছ ? আমি জানতাম তুমি আসবে |


সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে অতি যত্নের সাথে, নরম স্বরে বললে,হ্যাঁ পরী আমি ফিরে এসেছি,আমাকে যে ফিরে আসতেই হল তোমার কাছে, তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে পরী? আমি মনে মনে আমার ভাগ্যের উপর খুব হাসলাম,বললাম আমি যে পরী | আর মনে করলাম জেঠিমার সেই কথাটা “ আমরা যে ভারতীয় নারী,| 



সমাপ্ত 

পরী

Comments